ব্রেকিং:
নওগাঁর মহাদেবপুরে বিএনপির সম্মেলনে দু’গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ১০, আটক ৫

শনিবার   ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ২৩ ১৪২৬   ০৯ রবিউস সানি ১৪৪১

নওগাঁ দর্পন
সর্বশেষ:
আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় বুয়েটের ২৬ জন শিক্ষার্থীকে স্থায়ী বহিষ্কার ও ৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দিয়েছে বুয়েটে প্রশাসন
১৯৮

যে শোকে বাংলার ইতিহাস কাঁদে

ডেস্ক নিউজ

প্রকাশিত: ২ আগস্ট ২০১৯  

আমি কারবালা দেখিনি, এজিদকে দেখিনি, পড়িনি বিষাদ সিন্ধু, আমি দেখেছি জাতির জনকের বুক থেকে ঝরে যাওয়া শেষ রক্তবিন্দু। আমি সীমারকে দেখিনি, দেখিনি তার পাষ- বুক। আমি দেখেছি রক্তের স্রোতে ভাসা জাতির জনকের মুখ। আমি দেখিনি সীমারের খঞ্জর, দেখেছি মানুষ নামের কিছু বর্রর। আমি দেখিনি মীর জাফর, দেখিনি পলাশীর প্রান্তর। দেখেছি ধানম-ির বত্রিশ নম্বর। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট, জাতির দীপ্তকণ্ঠের প্রতিনিধি, শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালী, বাংলার স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে ধানম-ির ৩২ নম্বরে ঘাতকরা নির্মমভাবে হত্যা করে। যে শোকে আজও কাঁদে ইতিহাস। সেই রক্তে রাঙ্গা দুঃখের কাহিনী বলতে গেলে অশ্রু ঝরে ইতিহাসের বালুচরে। ইতিহাস কেঁদে কেঁদে কয়, এ শোক চোখের জলে মুছে যাবার নয়।

১৫ আগস্ট বাঙালী জাতির জীবনে ভয়াবহ এক শোকের দিন। যে শোক ভোলা যাবে না কোনদিন। স্মৃতির পাতায় ভুলিনি সবাই, সেই দিন কি ঘটেছিল এই সোনার বাংলায়। ৭৫ এর ১৫ আগস্টের ভোরে, গভীর শোকে কেঁদে উঠেছিল বাংলাদেশ, যে কান্নার আজও হয়নি শেষ। বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে সেদিন বাংলার মানুষকে কাঁদতে দেখেছি। দু’চোখ ঢেকে যেমন কাঁদে রাতের বেদনায় পরাজিত পৃথিবী। পদ্মা মেঘনা যমুনার পানি, সেদিন শোকে থেমে গিয়েছিল জানি।

সংঘাতময় এ পৃথিবীতে, আবহমানকাল ধরে চলে আসছে, ন্যায়-অন্যায়ের সংঘাত, সুন্দর-অসুন্দরের সংঘাত, ঘৃণা-ভালবাসা, শান্তি-অশান্তি, অসুর আর মানবতার সংঘাত। নিরবচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরায় চলে আসা ইতিহাসের আমোঘ ধারায়, ন্যায় এবং সত্যকে বার বার মোকাবেলা করতে হয়েছে অন্যায়-অসত্যকে, ভেতর বাহিরের কুটিল ষড়ষন্ত্রকে। এ সংঘাতের মোকাবেলায় কত মহাপুরুষের রক্তে ভিজে গেছে পৃথিবীর বুক, সৃষ্টি হয়েছে ইতিহাসের ভয়াবহ সঙ্কট, বিপন্ন হয়েছে মানবতা, তার ইয়ত্তা নেই।

আততায়ীর হাতে মহাপুরুষের মৃত্যুবরণ যেমন সংঘাতের এক অনিবার্য ঘটনা, তেমনি প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়ক ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হওয়ার ঘটনা ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। ইসলামের মহান চার খলিফার তিনজনই যেমন শহীদ হয়েছেন আততায়ীর হাতে, তেমনি এ গুপ্ত হত্যার তালিকায় ছিলেন ক্রুসেড বিজয়ী বীর সেনানী সালাহউদ্দিন আয়ুবী ও ইমাম ইবনে তায় মিয়ার ন্যায় মনীষীও। এজিদের নৃশংসতায় কারবালা প্রান্তরে সংঘটিত মর্মান্তিক হৃদয়বিদারক ঘটনার বেদনাদায়ক চিত্র আজও ইতিহাসের পাতায় অঙ্কিত। শহীদ হয়েছেন ইমাম হাসান, ইমাম হোসেনসহ মহানবী (স) এর অসংখ্য অনুসারী। কারবালা প্রান্তরে এজিদের নৃশংসতা ও বর্বরতার শিকার নারী-পুরুষের আর্তনাদ, বিষাদের ছায়া আর শহীদের বিন্দু বিন্দু রক্তে রচিত হয়েছে বিষাদসিন্ধু।

বিষপানে হত্যা করা হয়েছে সক্রেটিসকে, ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে যিশুখ্রিস্টকে। এ সংঘাতের কারণেই জীবন প্রদীপ নিভে গেছে রোমের সিজার, জায়ারের লুবাম্বা, গ্রানাডার মরিস বিশপ, চিলির আলেন্দেসহ অসংখ্য মহাপুরুষের। আততায়ীর বুলেটের নির্মম আঘাতে জীবন দিতে হয়েছে এ উপমহাদেশের মহাত্মা গান্ধী, লিয়াকত আলী খান, ইন্দিরা গান্ধীসহ বিশ্বের জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়ক আব্রাহাম লিংকন, জন, এফ, কেনেডির মতো মহান নেতাকে। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় টিপু সুলতানের বীরত্ব ও দেশপ্রেম ব্যর্থ হয়েছে, তাঁকে জীবন দিতে হয়েছে শুধু এদেশের আলো, বাতাস, অন্নে পুষ্ট কতিপয় বিশ্বাসঘাতক মোনাফেকদের ষড়যন্ত্রের কারণে।

মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় যেমন বাংলার শেষ সূর্য অস্তমিত হয়েছে পলাশী প্রান্তরে, তেমনি জীবন দিতে হয়েছে বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে মীরনের আদেশে মোহাম্মদী বেগের হাতে। ন্যায়-অন্যায়ের এ সংঘাতের কারণেই মনসুর হেযাজের মতো সত্যবাদী ধার্মিককেও কতল করা হয়েছে। মনসুর হেযাজ অন্যায়, অসত্যের সঙ্গে কখনও আপোস করেননি, সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। তাই তার দ্বিখ-িত মাথা তখনও বলেছে ‘আনাল হক’ অর্থাৎ আমিই সত্য। এসব হত্যাকা- যেমন নিছক হত্যাকা- নয়, সংঘাতের অশুভ পরিণতি তেমনি জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়ককে হত্যার মাধ্যমে ক্ষমতা দখলও কোন অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট, শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালী, বাঙালী জাতীয়তাবাদের অগ্রদূত, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যা আবহমানকাল ধরে চলে আসা ন্যায়-অন্যায়ের সংঘাত থেকে বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়, দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত এবং ছক বাঁধা এক প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের বাস্তবায়ন।

’৭৫ এর ১৫ আগস্ট অন্ধকারের পেটচিড়ে যখন বেরিয়ে আসে সোনালি ভোর, কিচির-মিচির শব্দ করে রাতজাগা পাখিগুলো ঘোষণা করছে রাতের শেষ প্রহর, মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ভেসে আসছে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি, তখন ধানম-ির ৩২ নম্বরে ঘটে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়। মীর জাফরের রক্তের কণিকা বহনকারী কিছু উচ্চাভিলাষী, বিপথগামী ও উচ্ছৃঙ্খল সেনাসদস্য স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকারদের সহায়তায় অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করে সময়ের নির্ভীক পুরুষ, জাতির দৃপ্তকণ্ঠের প্রতিনিধি, শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালী, মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক, বাংলার স্থপতি ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। পবিত্র জুমার দিন, ফজরের নামাজের সময় মীর জাফরের দল হত্যা করল একজন শ্রেষ্ঠ মানবকে, একজন উদারচিত্তের মানবতাবাদী মহৎ মানুষকে, সর্বোপরি একজন মুসলমানকে। অসুরের হাতে বলি হলো একজন পবিত্র মানুষ। পবিত্র রক্তে আবারও ভিজে গেল পৃথিবীর বুক। বাঙালী জাতি হারাল তাদের জাতির জনককে, বিশ্ব হারাল এক মহান নেতাকে।

এই নৃশংস হত্যাকা- ও বিভীষিকার ভয়াবহতা বোঝার ভাষা নেই। পৃথিবীর সকল ভাষার সকল শব্দ উজাড় করে দিয়েও এই বর্বরতার চিত্র তুলে ধরা যাবে না। শুধু এইটুকু বলা চলে, ছয় শ’ বছর পর বাংলার সবুজ প্রান্তরে কবর থেকে যেন উঠে এসেছিল তৈমুরের প্রেতাত্মা কিংবা তেরো শ’ বছরের আগের এজিদের বংশধররা। ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট অসুরের দল শুধু জাতির জনককেই নয়, ধানম-ির ৩২ নম্বরে আরও হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী, জীবনের সুখ দুঃখের সাথী বেগম ফজিলাতুন্নেছা, একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল, রোজী জামাল এবং সর্ব কনিষ্ঠ শিশুপুত্র শেখ রাসেলকে।

কচি মুখ মায়াবী চোখ, নির্মল হাসির অবুঝ শিশু রাসেলের বাঁচার আকুতির বিনিময়ে ঘাতকরা কচি বুকটা ঝাঁজরা করে বুলেটের আঘাতে। পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে তারও বুকের তাজা রক্তে ভেসে যায় মেঝে, মাঝখানে নীরব, নিথর প্রাণহানি অবস্থায় পড়ে থাকে ক্ষত-বিক্ষত দেহ। শিশু রাসেল অসুরদের বাধা দিতে পারেনি, ভাগ্যকে মেনে নিয়েছে নীরবে। এছাড়া তার আর কোন উপায় ছিল না। নির্মম বুলেটের আঘাত ও রক্তক্ষরণে নিঃশেষ প্রায় ওষ্ঠাগত প্রাণ নিয়ে শিশু রাসেল হয়ত বা একবার বলেছে, ‘হে পৃথিবীর মানুষ! তোমরা একবার দেখ, একদল অসুরের হাতে কিভাবে জীবন দিতে হলো একজন নিরপরাধ, নিষ্পাপ, অসহায় শিশুকে। অসুরদের সঙ্গে রাজনৈতিক মতানৈক্য, রাজনৈতিক বিরোধ থাকতে পারে আমার বাবার, আমার ভাইয়ের। আমি তো রাজনীতি বুঝি না, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র বুঝি না, আমি শিশু, আমি নিরপরাধ, আমি নিষ্পাপ, আমার কোন শত্রু নেই, সারা বিশ্ব আমার জন্য অভয়ারণ্য, তবুও আমাকে কেন জীবন দিতে হলো অসুরের হাতে। এ প্রশ্ন আমার পৃথিবীর মানুষের কাছে।’

অবুঝ শিশু রাসেলের কান্না পায়নি সেদিন মানবতার ছোঁয়া। রাতের নিস্তব্ধতা ও অশুভ শক্তির বেষ্টনী ভেদ করে পৌঁছায়নি পৃথিবীর মানুষের কানে। কিন্তু ইথারে ভাসতে ভাসতে পৌঁছে গেছে আল্লাহর দরবারে, প্রচ- ঝাঁকুনিতে কেঁপে উঠেছে আল্লাহর আরশ যা আমরা বুঝতে পারিনি, অনুভব করতে পারিনি। এটা আমাদের অজ্ঞতা, আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা। আল্লাহর কি অপার মহিমা! বিদেশে থাকার কারণে বেঁচে যান ভাগ্যগুণে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা আমাদের প্রিয় নেত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর তার ছোট বোন শেখ রেহানা। কিন্তু স্বজন হারানোর ব্যথায় ক্ষত-বিক্ষত তাঁদের হৃদয়, বিভীষিকাময় ও দুর্বিষহ কালরাতের স্মৃতি আজও তাদের জীবনের একমাত্র সম্বল।

’৭৫ এর ১৫ আগস্ট প্রকৃত অর্থে কোন সামরিক অভ্যুত্থান ছিল না। ছিল ১৭৫৭ সালের ইংরেজ বেনিয়াদের ষড়যন্ত্র ও দেশীয় দালালদের সহযোগিতায় পলাশী প্রান্তরে সংঘটিত বিয়োগান্ত নাটকেরই পুনরাবৃত্তি। ভাগ্যের সেই একই পরিহাস। যাঁর যৌবনের উত্তাপে গড়া এ সোনার বাংলা, তাঁর রক্তাক্ত লাশ সিঁড়িতে ফেলে রেখে খুনীর দল এগিয়ে যায় ক্ষমতার মসনদের দিকে। যার সারা জীবনের এত সাধনার ধন, সোনার বাংলা, তাঁর অস্তিম যাত্রায় কফিন আচ্ছাদিত হয়নি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকায়, বিউগলে বেজে ওঠেনি শেষ বিদায়ের করুণ সুর। যাঁর সারা জীবনের ত্যাগ ও শ্রমের ফসল বাঙালী জাতির স্বতন্ত্র আবাসভূমির ঠিকানা, তাঁর সমাধির জন্য রাজধানীতে জোটেনি সাড়ে তিন হাত জায়গা। বঙ্গবন্ধুর রক্তাক্ত লাশ খুনীদের উল্লাস নৃত্যের মধ্য দিয়ে মাটিচাপা দেয়া হয় নিজ জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়ায়। আজ সময়ের ব্যবধানে টুঙ্গিপাড়া হয়ে উঠেছে বাঙালী জাতির তীর্থস্থান। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর মাজার দেখলে মনে হয় স্বাধীনতার সোনালি ইতিহাস গায়ে জড়িয়ে সারা বাংলা ঘুমিয়ে আছে টুঙ্গিপাড়ার সবুজ মাঠে।

’৭৫ এর ১৫ আগস্টের ঘটনার আকস্মিকতায় সমগ্র জাতি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং এর প্রতিবিপ্লব ঘটাতে পারেনি, এ কথা সত্যি। কিন্তু হিমালয় পর্বতের ন্যায় যার ব্যক্তিত্ব, আকাশের উদারতা আর সাগরের বিশালতায় সারা বাংলাজুড়ে যার অস্তিত্ব, ইতিহাস থেকে তাঁর নাম, তাঁর অবদান, তাঁর গৌরব রক্তপাত ঘটিয়ে বিলুপ্ত করা যায় না। সময় যার হাতে তুলে দিয়েছে কীর্তি ও গৌরবের পুরস্কার, ইতিহাসে যার নাম রয়েছে লেখা স্বর্ণাক্ষরে, তাঁর কৃতিত্ব, তাঁর যশ তাঁকে হত্যা করে মুছে ফেলা যায় না। বরং সে গৌরবের দীপ্তি ও মর্যাদা আরও বেড়ে যায়। আর হত্যাকারীদের স্থান হয় মানুষের সীমাহীন ঘৃণা ও ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে। এসব ইতিহাসের অমোঘ বিধান। এ বিধানকে যারা লঙ্ঘন করেছে, মানব সভ্যতার সমস্ত রীতিনীতি জলাঞ্জলি দিয়ে ন্যায়কে অন্যায়, সত্যকে অসত্য দ্বারা পরাভূত করতে চেয়েছে, তারা আসলে ছুটেছে মিথ্যে মরীচিকার পিছে। যার সাক্ষী আমাদের এই আকাশ, বৃক্ষ, প্রকৃতি।

ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। পলাশী প্রান্তরের বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর, মীরন, মোহাম্মদী বেগ, ঘষেটি বেগম, রায় দুর্লভ, জগৎশেঠ, উমিচাঁদ বিশ্বাসঘাতকতার কাফ্ফারা কাকে বলে, ইতিহাসের পরতে পরতে চিনিয়ে দিয়ে গেছে। প্রধান বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর হতে চেয়েছিল মহবত জঙ্গ, কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! শেষ পর্যন্ত হয়েছিল ক্লাইভের গাধা। দেনার দায়ে রাজকার্য চালাতে পারত না, বিশ্বাসঘাতকতার শেষ পরিণতির কথা ভেবে ভাঙ্গ খেয়ে চুর হয়ে পড়ে থাকত। ইংরেজদের দেনা মেটাতে গিয়ে মীর জাফর বর্ধমান, নদীয়া জেলার গোটা খাজনা ইংরেজদের নামে লিখে দিতে বাধ্য হয়। খাজনা আদায়ের শাসনযন্ত্রে যেই ইংরেজদের প্রবেশ শুরু হলো, গোটা দেওয়ানি ও নিজামত তাদের হাতে চলে না যাওয়া পর্যন্ত আর শেষ হলো না। ইংরেজরা দেনার দায়ে মীর জাফরকে একবার ক্ষমতাচ্যুত করেছিল, আবার তারাই কৃপা করে তাকে মসনদে বসিয়েছিল, কিন্তু মসনদ চালাবার ভাগ্য হলো না। অচিরেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে সে কুষ্ঠ রোগে ধুঁকে ধুঁকে মারা গেল। তারপরও তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত হলো না। আজও বাংলার মানুষ বিশ্বাসঘাতককে ঘৃণাভরে মীর জাফর বলে গালি দেয়, তার মাজারে জুতা রেখে জিয়ারত করে সিরাজের মাজার।

ষড়যন্ত্রকারীদের একজন ঘষেটি বেগম তার সমস্ত লুকানো ধনরতœ দিয়ে মীর জাফরকে সাহায্য করেছিল। তার পরিণতিও ভাল হয়নি, যথারীতি বিশ্বাসঘাতকতার ফলভোগ করেছে। মীর জাফর মসনদে আরোহনের পর নিষ্ঠুর মীরনই মোটামুটি রাজকার্য চালাত। তার আদেশেই আর এক নবাব নন্দিনী আমেনা বেগমের সঙ্গে ঘষেটি বেগমকেও পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়। দু’বোন ডুবে মরার আগে মীরনের মাথায় বজ্রপাতের অভিসম্পাত করে যায়।

মীর জাফরের পুত্র মীরন, লোকে তাকে ছোট নবাব বলে ডাকত, তার সকল দুষ্কর্মের সাথী ছিল খাদেম হোসেন। মীর জাফরের জমানায় সে পুর্নিয়ার ফৌজদারি লাভ করেছিল। একদিন হঠাৎ করেই মীরন ও খাদেম হোসেনের মধ্যে লাঠালাঠি শুরু হয়ে গেল। বিদ্রোহী খাদেম হোসেনের পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে খোলামাঠে তাঁবুর মধ্যে বিনা মেঘে বজ্রপাতে মীরন নিহত হলো। আর খাদেম হোসেন প্রাণের ভয়ে তরাইযের নিদ্রি অরণ্যের মধ্যে পালিয়ে চিরতরে লোকচক্ষুর অন্তরাল হলো।

ষড়যন্ত্রের অপর নায়ক রায় দুর্লভ মীরনের আদেশে দু’দিনের দেওয়ানি রাজবল্লভের হাতে ছেড়ে দিয়ে ধন ও মান নিয়ে কলকাতায় পালিয়ে বাঁচলেন। কিন্তু তার সঞ্চিত ধন উত্তরাধিকারীদের ভোগে লাগল না। তার একমাত্র সন্তান মুকুন্দবল্লভ তার জীবদ্দশায় মৃত্যু মুখে পতিত হওয়ায় রায় দুর্লভের বংশ লোপ পেল। জগৎশেঠ, মহাতাব রায় ও মহারাজা স্বরূপচন্দের পরিণাম হলো আরও ভয়াবহ। ইংরেজদের মিত্র বলে নবাব মীর কাশিম এই দুই শেঠকে গঙ্গার জলে ডুবিয়ে মারলেন। জগৎশেঠের পরিবার ব্যবসায় যে ঘা খেল, তা আর সামলে উঠতে পারল না। দেওয়ানি হাতে পেয়ে ক্লাইভ তাদের উত্তরাধিকারীর হাত থেকে রাজকোষের চাবি ছিনিয়ে নিলেন। এভাবে পলাশী যুদ্ধের বিশ বছরের মধ্যে প্রায় সকল ষড়যন্ত্রকারী সমূলে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।

আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা ইতিহাস পড়ি কিন্তু ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি না। ’৭৫ এর প্রধান মীর জাফর খন্দকার মোশতাক হতে চেয়েছিল একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু সে ক্ষমতা স্থায়ী হয়নি। মাত্র ৮১ দিনের মাথায় মোশতাক ক্ষমতাচ্যুত হয়ে চুরির দায়ে জেলে যায়। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে আর কোনদিন জনসম্মুখে বেরোয়নি। আপন বাসভবনে বন্দী অবস্থায় নিজ কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা এবং বিবেকের দংশনে মানুষের আদালতকে ফাঁকি দিয়ে ধুঁকে ধুঁকে এগিয়ে যায় মৃত্যুর দিকে। বিচার শুরু হয় বিধাতার আদালতে, নিজের সন্তানও মীর জাফরের সন্তানের পরিচয়ে এদেশে বাস করতে চায় না।

নওগাঁ দর্পন
নওগাঁ দর্পন
এই বিভাগের আরো খবর