শনিবার   ২০ জুলাই ২০১৯   শ্রাবণ ৪ ১৪২৬   ১৭ জ্বিলকদ ১৪৪০

নওগাঁ দর্পন
সর্বশেষ:
ধামইরহাটে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ উপলক্ষ্যে র‌্যালি ও পুরুস্কার বিতরণী মান্দায় ৩টি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী সবাই ফেল! নিয়ামতপুরে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের উদ্বোধন আত্রাইয়ে মৎস্য সপ্তাহ উপলক্ষে শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভা মান্দায় তিন বছরের শিশুকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে আটক ১ রাণীনগরে ছাত্রলীগের উদ্যোগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৃক্ষ রোপণ রেলপথের দাবিতে হাঁপানিয়ায় মানববন্ধন নওগাঁয় মৎস্য সপ্তাহের উদ্বোধন উপলক্ষে র‍্যালী ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত মান্দায় বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ ভেঙে ৩১ গ্রাম প্লাবিত জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ উপলক্ষে রাণীনগরে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও আলোচনা অনুষ্ঠিত
৭৩

বদলগাছীতে ফসলি জমির মাটি বিক্রির মহোৎসব

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১০ জুলাই ২০১৯  

নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার কসবা গ্রামে ফসলি জমির মাটি কেটে বিক্রির চলছে মহোৎসব । জমির মালিকেরা তাঁদের জমি ব্যবসায়ীদের কাছে ইজারা দিয়েছেন। এসব ব্যবসায়ীরা ফসলি জমির মাটি কেটে ইটভাটার মালিক ও রাস্তার ঠিকাদারদের কাছে বিক্রি করছেন।

জমি থেকে গভীর করে মাটি তোলায় আশপাশের ফসলি জমিগুলোতে ধস দেখা দিয়েছে। এভাবে মাটি কাটা অব্যহত থাকলে কসবা গ্রামের ফসলি মাঠটি খাল-বিলে পরিণিত হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

তাঁদের অভিযোগ, ৫-৬ বছর ধরে কসবা গ্রামের ফসলি মাঠের জমির মাটি কাটার চলছে মহোৎসব । এখন মাঠের অনেক জমির শ্রেণি পরির্বতন হয়ে গেছে। ফসলি জমির মাটি কাটা বন্ধের জন্য ভূমি অফিস, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে বারবার অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পাচ্ছেন না এলাকাবাসী।

গত শনিবার সরেজমিনে কসবা গ্রামে ফসলি মাঠে গিয়ে দেখা যায়, ফসলি মাঠটিতে মাটি কাটার চলছে মহোৎসব । গ্রামের ফসলি মাঠটির ৪/৫টি স্থানে বিশাল অংশজুড়ে দুই/তিন ফসলি জমির মাটি গভীর করে মাটি কাটার কাজ চলছে। প্রতিটি স্থানেই এক সঙ্গে ৫-৬ টি ট্র্যাক্টর এসে মাটি নিয়ে যাচ্ছে। অবাধে ট্র্যাক্টর চলাচল করায় সাগরপুর থেকে কসবা গ্রাম পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার পাকা সড়কটি প্রায় নষ্ট হয়ে যেতে বসেছে।

সাগরপুর গ্রাম থেকে একশ গজ দূরে কসবা ফসলি মাঠে নেমে দেখা গেল, সেখানে ৪-৫ বিঘা জমিজুড়ে গভীর করে মাটি কেটে ট্র্যাক্টরে তোলা হচ্ছে। সেখানে একটি লোক একটি টালি খাতা নিয়ে বসে আছে।

সেই খাতাই ফসলি জমির মাটি বিক্রির হিসেব লিপিবদ্ধ আছে। প্রতি ট্র্যাক্টর মাটি একশ বিশ টাকা করে বিক্রি দেওয়ার কথা লেখা রয়েছে।

ওই জমি থেকে গভীর করে মাটি কাটায় সেটি এখন খালে পরিণিত হয়েছে। ইটভাটা ও রাস্তার কাজে সেখান থেকে ফের মাটি কাটায় আশপাশের উঁচু জমিগুলো ধসের হুমকিতে রয়েছে।

সেখানে থাকা একটি ট্র্যাক্টর চালক বলেন, আমার বাড়ি আক্কেলপুর পৌরশহরে। জমির মালিক তাঁর জমিটি একজনকে ইজারা দিয়েছেন। ইজারাদারেরা প্রতি ট্র্যাক্টর মাটি একশ বিশ টাকা দাম নিচ্ছে। রাস্তার ঠিকাদার ও ইটভাটার মালিক প্রতি ট্র্যাক্টর মাটি সাড়ে পাঁচশ টাকায় কিনছেন। প্রতিদিন গড়ে একটি ট্র্যাক্টর ১০-১৫ টি ট্রিপ দিচ্ছে।

ওই স্থানটির প্রায় দুই গজ দূরত্বে একইভাবে মাটি কাটার কাজ হচ্ছিল। সেখানে ৪-৫ টি ট্র্যাক্টর এসে মাটি নিয়ে যাচ্ছে। কসবাগ্রামের পচার মোড়ে গিয়ে দেখা গেল, সেখানে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির পাশ থেকে গভীর করে মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে। বৈদ্যুতিক খুঁটির পাশের মাটি আলগা করায় সেটি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। মাটি কেটে নেওয়ার কারণে সেই স্থানটি খালে পরিণিত হয়েছে। উঁচুতে থাকা বসত বাড়িগুলো মাটি ধসের হুমকিতে রয়েছে।

কসবা ও সাগরপুর গ্রামবাসীরা জানান, বিগত ৫/৬ বছর আগে থেকে কসবা ফসলি মাঠ থেকে মাটি বিক্রির শুরু হয়। মামুন মেম্বার, লালচঁাদ, ছালাম সহ ৫-৬ জন জমির মালিক তাঁদের জমির বালু ও মাটি ব্যবসায়ীদের কাছে ইজারা দিয়েছেন। এসব ব্যবসায়ীরা দুই/তিন ফসলি জমির মাটি কেটে ইটভাটার মালিক ও রাস্তার ঠিকাদারদের কাছে বিক্রি করছেন। আর প্রতিদিন গড়ে ২-৩ শ ট্র্যাক্টর বালু ও মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। গভীর করে মাটি কেটে নেওয়ার কারণে উচুঁ ফসলি জমি ধসে পড়ছে। এখন পুরো মাঠজুড়ে ৪-৫ টি স্থানে মাটি কাটার কাজ চলছে। অবাধে ট্র্যাক্টর চলাচল করায় গ্রামের সড়কটি নষ্ট হয়েছে।

ফসলি জমির মাটি কেটে বিক্রি বন্ধ করতে তাঁরা ইউনিয়ন ভূমি অফিস, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের জানিয়েছিলেন। কিন্তু একাধিক জনপ্রতিনিধি ইটভাটা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকায় তাঁরা কোন ব্যবস্থা নেননি। ইটভাটার মালিকদের স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সখ্যতা রয়েছে। ফলে ফসলি জমির মাটি কাটা বন্ধ হচ্ছে না। সরকারের উচ্চ পযার্য়ে কর্মকতার্দের বিষয়টি নজর দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

কসবা গ্রামের বাসিন্দা ও পাশের্বর জমির মালিক শহিদুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ফসলি জমি কেটে মাটি বিক্রি বন্ধের জন্য ভূমি অফিস, ইউএনও অফিস ও ইউনিয়ন পরিষদ সবখানে গেছি। কিন্তু কেউ মাটি কাটা বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়নি। আমরা গরীব মানুষ আমাদের জমিজমা ধসে গেল কারও কিছুই আসে-যায় না।

কসবাগ্রামের বাসিন্দা দিপক কুমার বলেন, গত ২০১৫ সালে র‍্যাব সদস্যরা এসে কসবা পচার মোড়ে ট্র্যাক্টরসহ মাটি উত্তোলনকারীকে ধরেছিল। তারপরও এখানে মাটি কাটার কাজ বন্ধ হয়নি।

একই গ্রামের হরিপদ বলেন, ফসলি জমির মাটি কেটে বিক্রি দেওয়ায় মাঠের অন্য জমিগুলো ধসের সৃষ্টি হয়েছে। অবাধে ট্র্যাক্টর চলাচল করায় গ্রামের সড়কটি নষ্ট হয় গেছে। সড়কটি দিয়ে পায়ে হেঁটে চলাচল করা যাচ্ছে না। ইউএনও, স্থানীয় ইউপির চেয়ারম্যানকে তাঁরা ঘটনাটি জানিয়েছেন।

আসাদ নামে এক বালু ও মাটি ব্যবসায়ী বলেন, জমিতে ফসল হয় না। তাই জমির মালিক মামুন মেম্বার ও লাল চাঁদ আমাদের কাছে জমির মাটি বিক্রি করছেন। এতে ফসলের চেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

ভূমি অফিস সুত্রে জানাযায়, কোন জমির মালিক নিজ ইচ্ছে মতো জমির শ্রেণি পরিবর্তন করতে পারবেনা। কেউ নিজ ইচ্ছে মতো জমির শ্রেণি পরিবর্তন করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বদলগাছী উপজেলা কৃষি অফিসার হাসান আলী বলেন, ফসলি মাঠে জমির মাটি কেটে বিক্রি দেওয়ায় অন্য জমিগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। জমির শ্রেণিও পরিবর্তন হচ্ছে।

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বদলগাছী কাযার্লয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী হারুনুর আর রশিদ বলেন, বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাগরপুর গ্রাম থেকে কসবা গ্রাম পর্যন্ত আটশ মিটার সড়ক পাকাকরণ করেছে। মাঠের মাটি উত্তোলন কাজে অবাধে ট্র্যাক্টর চলাচল করায় সড়কটির বেহাল অবস্থার সৃষ্টি হতে যাচ্ছে।

বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাসুম আলী বেগ বলেন, কসবা গ্রামে ফসলি জমির বালু ও মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে বলে আমি প্রথম শুনলাম। আইন অমান্যকরে বালু ও মাটি উত্তোলনকারীদের বিরদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 

স/শাহা

নওগাঁ দর্পন
নওগাঁ দর্পন
এই বিভাগের আরো খবর