মঙ্গলবার   ১৮ জুন ২০১৯   আষাঢ় ৫ ১৪২৬   ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

নওগাঁ দর্পন
৩৫

নওগাঁয় যৌতুকের টাকা না পেয়ে স্ত্রীকে নির্যাতন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৯ জুন ২০১৯  

নওগাঁর পত্নীতলায় সুরাইয়া পারভীন (৩৪) নামে এক গৃহবধুকে মধ্যযুগীয় কায়দায় শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। পা ধরে অনুনয় বিনয় ও বহু কান্নাকাটি করার পরও অমানুসিক নির্যাতন থেকে রক্ষা পায়নি ওই গৃহবধু। পশুর মতো হাত-পা বেঁধে সারা শরীরে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়।

যা ১৪’শ বছর আগের আরবের আইয়ামে জাহেলিয়াতকেও হারমানিয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে জেলার পত্নীতলা উপজেলার বাদ পুইয়া গ্রামে। পাষন্ড স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির লোকজনের নির্যাতনের শিকার গৃহবধু সুরাইয়া পারভীন এখন মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রয়েছেন।

ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালে পত্নীতলা উপজেলার বাদ পুইয়া গ্রামের মকবুল হোসেনের (৩৬) সঙ্গে পাশের মহাদেবপুর উপজেলা সদরের স্কুল পাড়া এলাকার আব্দুর রহিমের মেয়ে সুরাইয়া পারভীনের (৩৪) পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে স্বামী যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে প্রায়ই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে আসছে। বাবার পক্ষে যৌতুকের টাকা দেয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দেয়া হলে নির্যাতনের মাত্রা আরো বেড়ে যায়।

এ ব্যাপারে স্থানীয়ভাবে একাধীকবার গ্রাম্য শালিসহয়েছে। তবুও থমেনি নির্যাতন। পরে নির্যাতন সইতে না পেরে ২০১৮ সালে বাবার বাড়ি ফিরে আসতে হয় সুরাইয়া পারভীনকে।

নির্যাতিত গৃহবধুর মা আছিয়া খাতুন জানান, সেসময় জামাতাকে যৌতুক হিসেবে নগদ একলাখ টাকা, স্বর্ণালংকার, খাট, আলমিরাসহ প্রায় দুই লক্ষাধিক টাকার মালামাল যৌতুক দেয়া হয়।

মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন গৃহবধু সুরাইয়া পারভীন জানান, ‘বিয়ের পর থেকেই কখনো নগদ টকা, কখনো মোটরসাইকেল, কখনো মোবাইল ফোন বাবার বাড়ি থেকে এনে দেয়ার জন্য বিভিন্ন সময় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে আসছিলো। গত ৫ জুন বুধবার বিকেলে নির্যাতন না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাবার বাড়ি থেকে আমার স্বামী আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে যায়। ওইদিন রাত থেকে শুরু হয় আবারো যৌতুকের দাবিতে মারপিট। দাবিকৃত যৌতুকের টাকা দিতে অস্বীকার করলে আমার স্বামী মকবুল হোসেন (৩৬) ও তার দুই ভাই নজরুল কবীর (৩২) এবং বেলাল হোসেন(৩০) রাতে আমার মুখ কাপড় দিয়ে বাঁধে। এরপর সারা রাতভর চালানো হয় মধ্যযুগীয় কায়দায় শারীরিক নির্যাতন। সারা শরীরে কিল-ঘুষিসহ লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। এ সময় আর্তচিৎকারে কেউ উদ্ধারে এগিয়ে আসেনি।

পরদিন ৬ জুন বৃহস্পতিবার আমাকে ঘড়ে আটক রাখা হয়। যৌতুকের টাকার জন্য নির্যাতন করে ঘরে আটকে রাখার বিষয়টি ওইদিন আমার ছোট মাকে জানালে পরিবারের সদস্যরা পত্নীতলা থানা পুলিশের সহযোগিতায় আমাকে উদ্ধার করে মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।’

এ বিষয়ে অভিযুক্ত মকবুল হোসেনের বক্তব্য গ্রহনের জন্য বিভিন্ন মাধ্যমে একাধীকবার যোগাযোগের চেস্টা করেও তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

নির্যাতিতার ছোট বোন নাবিয়া সুলতানা জানান, ‘খবর পেয়ে তাৎক্ষনিক আমি স্থানীয় সাংবাদিক বরুন মজুমদরকে সাথে নিয়ে ওই বাড়িতে যাওয়ার পর ভগ্নিপতি ও তার স্বজনরা আমাদের গালাগাল করে এবং মারধর করার জন্য উদ্যত্ত হয়। এরপর থানায় জানালে পুলিশ ওই বাড়িতে গিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় সুরাইয়া পারভীনকে উদ্ধার করেন। এ ব্যাপারে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলেও জানান তিনি।’

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন থাকার সত্যতা নিশ্চিত করে মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আখতারুজ্জামান আলাল জানান, ‘গুরুতর আহত অবস্থায় ওই গৃহবধুকে তার স্বজনরা হাসপাতালে ভর্তি করে। তার শরীরে মারপিটের চিহৃ রয়েছে।’

এ ব্যাপারে পত্নীতলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) পরিমল চক্রবর্তী জানান, ‘খবর পেয়ে ওই গৃবধুকে উদ্ধার করে তার পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। এ বিষয়ে এখনো কোন লিখিত অভিযোগ পওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই তদন্ত পূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন হবে।’

নওগাঁ দর্পন
নওগাঁ দর্পন
এই বিভাগের আরো খবর