রোববার   ২০ অক্টোবর ২০১৯   কার্তিক ৫ ১৪২৬   ২০ সফর ১৪৪১

নওগাঁ দর্পন
সর্বশেষ:
পত্নীতলায় আদিবাসী প্রেমিক যুগলের লাশ উদ্ধার চাকুরির প্রলোভনে মান্দার মেয়েকে ঢাকায় ধর্ষণ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে যুক্ত হওয়া বোয়িং (৭৮৭-৮) ড্রিমলাইনার গাঙচিল উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধামইরহাটে মাদক সেবনের দায়ে ৬ জনের জেল ও জরিমানা আত্রাইয়ে ডেঙ্গু সচেতনতা মূলক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সাপাহারে পরিস্কার অভিযান সাপাহার ঐতিহ্যবাহী জবই বিলে মাছের পোনা অবমুক্ত আত্রাই থানা পুলিশের অভিযানে ৯জন আটক গ্রেনেড হামলার প্রতিবাদে নিয়ামতপুরে আলোচনা সভা সাপাহারের করল্যা চাষে বিপ্লব
১২৬

জাসদ গণঅভ্যুত্থানে ব্যর্থ হয়ে সেনা অভ্যুত্থানের পথে হাঁটে

পীর হাবিবুর রহমান

প্রকাশিত: ১০ জুন ২০১৯  

সিরাজুল আলম খান।

সিরাজুল আলম খান।

জাসদ গণঅভ্যুত্থানে ব্যর্থ হয়ে সেনা অভ্যুত্থানের পথে হেঁটেছিল। রাজনীতির রহস্যপুরুষ, স্বাধীনতা সংগ্রামী ও জাসদ সৃষ্টির রূপকার সিরাজুল আলম খানের জবানবন্দিতে লেখা ‘আমি সিরাজুল আলম খান’ বইয়ে এই চিত্র উঠে এসেছে। গণঅভ্যুত্থানে ব্যর্থ হয়ে সেনা অভ্যুত্থানেও তাদের ব্যর্থতা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল তাহের বীরউত্তমের বেদনাদায়ক পরিণতির ঘটনা প্রবাহ বর্ণনা হয়েছে।

সিরাজুল আলম খান স্বাধীনতা-উত্তর ’৭২ সালের জুলাইয়ে বিভক্ত ছাত্রলীগের শেখ ফজলুল হক মণির সমর্থিত নূরে আলম সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন অংশের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সম্মেলনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যোগদান এবং পল্টনে সিরাজুল আলম খান সমর্থিত আসম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন অংশের পল্টনের সম্মেলনে না যাওয়া ঘিরে দলের ভাঙন ও জাসদ সৃষ্টির ঘটনা প্রবাহ বর্ণনা করেছেন। এমনকি বলেছেন, তার ও কাজী আরেফের সঙ্গে আবদুর রাজ্জাকের এই প্রথম দ্বিমত তৈরি হলো। আবদুর রাজ্জাককে শেখ মণির ধারার প্রতি সহানুভূতিশীল ও বঙ্গবন্ধুর প্রতি আনুগত্যে অন্ধ বলে মন্তব্য করেছেন।

সিরাজুল আলম খান শেখ মণির সমর্থকদের জাতীয়তাবাদী অংশ ও আসম রবের সমর্থিত অংশকে প্রগতিশীল বলে উল্লেখ করে বলেছেন, উভয় গ্রুপই তখনো বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি সমভাবে অনুগত ছিল। উভয় গ্রুপই তাই তাদের সম্মেলনে তাকে আমন্ত্রণ জানালে তিনি উভয়কেই যাবেন বলে কথা দেন।

সিরাজুল আলম খান বলেন, কিন্তু আগের রাতে বঙ্গবন্ধু তাকে ধারণা দিয়েছিলেন তিনি কোনো অংশের সম্মেলনেই যাবেন না। রবদের সম্মেলনের জন্য আমাকে কয়েক হাজার টাকা ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘সিরাজ, আমি কমিউনিস্ট হতে পারব না।’ এ কথা বলার সময় তার অভিব্যক্তি থেকে মনে হলো, তিনি কোনোমতেই রবদের সম্মেলনে যাবেন না। আবার ‘আমি কমিউনিস্ট হতে পারব না’- এ কথার অর্থ এও হতে পারে যে, আমার ও তার রাজনীতি ভবিষ্যতে আর এক পথ ধরে এগোবে না। রাত দেড়টায় যখন ৩২ নম্বর থেকে তিনি বের হয়ে এসএম হলে ফিরে আসেন তখন সেখানে আর কেউ ছিল না। ভোর ৫টার দিকে দৈনিক বাংলা থেকে একজন এসে তাকে জানায়, বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সের ছাত্রলীগের সম্মেলনে যাবেন এ সিদ্ধান্ত গভীর রাতে শেখ মণিকে জানিয়ে দিয়েছেন।

সিরাজুল আলম খানের মতে, তিনি বেরিয়ে আসার পর অজ্ঞাত কোনো কারণে বঙ্গবন্ধু কাউকে কিছু না জানিয়ে সিদ্ধান্ত নেন। তিনি নূরে আলম সিদ্দিকীর সম্মেলনে যোগ দিলেন। আর এভাবেই ছাত্রলীগের ভাঙন চূড়ান্ত স্থায়ী রূপ নেয়। সিরাজুল আলম খানের ভাষায়, সেদিন পল্টনে রবের সম্মেলন ছিল ‘প্রগতিশীল’ অংশের বিশাল সম্মেলন। আর নূরে আলম সিদ্দিকীর সম্মেলনটি ছিল কয়েকশ ছাত্রের উপস্থিতিতে ছাত্রলীগের ‘প্রতিক্রিয়াশীল’।

সিরাজুল আলম খান বলেছেন, সে সময় তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রচারের জন্য ১ জানুয়ারি ’৭২ সাল থেকে ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’ প্রকাশিত হতো। বিশেষ করে যুদ্ধের উত্তাপে টগবগ করতে থাকা যুব সমাজের মধ্যে অভূতপূর্ব সাড়া জাড়িয়েছিল। ’৭২ সালে ছাত্রলীগ বিভক্তির পর সারা দেশে দুই গ্রুপে সংঘর্ষ ঘটতে থাকে। ’৭৩ সালের ডাকসু নির্বাচনে রবপন্থি ছাত্রলীগের আ হ ম মাহবুবের নেতৃত্বাধীন প্যানেলের বিপুল ভোটের জয়লাভের সম্ভাবনা দেখে হলে হলে ব্যালট বাক্স ছিনতাই করা হয়। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার সম্পর্ক শীতল থাকলেও নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তিনি বঙ্গবন্ধুকে নিরপেক্ষ থাকার অনুরোধ জানান। মাঝে মাঝে মনে হতো তিনি নিরপেক্ষ। আবার দেখা যেত নূরে আলম সিদ্দিকীর ছাত্রলীগকে শর্তহীন আশীর্বাদ দিচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুকে কৃষক সংগঠন গড়ার পরামর্শ তিনি দিয়ে আসছিলেন। এক দিন সংবাদপত্রে দেখেন আবদুর রব সেরনিয়াবাদকে প্রেসিডেন্ট করে কৃষক লীগ গঠিত হয়েছে।

তিনি এ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে জানতে চাইলে বললেন, ‘এটা মণি করেছে’। এটি সিরাজুল আলম খান গ্রহণ করতে পারেননি। মনে হচ্ছে তাদের পথ আলাদা হয়ে যাচ্ছে। তারা তখন আবদুল মালেক শহিদুল্লাহকে সভাপতি ও হাসানুল হক ইনুকে সাধারণ সম্পাদক করে পৃথক কৃষক লীগ গঠন করেন।’

৭২ সালের অক্টোবরে শেখ ফজলুল হক মণিকে চেয়ারম্যান করে যুবলীগ গঠিত হয়। তখন তাদের সামনে বিকল্প সংগঠন গড়ে তোলা ছাড়া উপায় ছিল না। এর প্রধান দুটি কারণ ছিল। প্রথমত, সহস্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসা হাজার হাজার বিএলএফ কর্মী সংগঠক সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে শেখ মণির যুবলীগে চলে যাবে।

আদর্শগত দিক থেকে তিনি ও শেখ মণি আলাদা স্রোতের দুজন মানুষ। তিনি আওয়ামী লীগের কোনো পদে ছিলেন না। তাহলে তাদের পক্ষের হাজার হাজার কর্মী-সংগঠক কোথায় যাবে? প্রথমে আ স ম রবের নেতৃত্বে যুব সংগঠন করার চিন্তা করলেও পরবর্তীতে দীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ও কাজী আরেফ আহমেদ একমত হন নবগঠিত দলটি মুজিব বিরোধী নয়, আওয়ামী লীগ বিরোধী হবে। আদর্শ হবে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রকে লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করলে রবপন্থি ছাত্রলীগ এ নিয়ে সুসংগঠিত হতে থাকে।

চার ক্যাটাগরি থেকে ছয়জনকে নিয়ে ’৭২ সালের ৩১ অক্টোবর ‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল’-জাসদের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। মেজর জলিল ও আ স ম আবদুর রব হন সেই কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক। সদস্য হন শাজাহান সিরাজ, সুলতান উদ্দিন আহমেদ, বিধান কৃষ্ণ সেন, নূরে আলম যিকু ও রহমত আলী। রহমত আলী পরে আওয়ামী লীগে ফিরে যান।

ক্যাটাগরি চারটি ছিল- ১. যুব সমাজ, যারা ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল শক্তি, যুব শক্তি, রাজনীতিসচেতন আদর্শবাদী দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধারা এর অন্তর্ভুক্ত। ২. নিয়মিত সৈনিক, যারা সশস্র স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। ৩. আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা। ৪. জনপ্রিয় ও কলুষমুক্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।

যুবলীগ গঠনের পর চার-পাঁচ দিন সময়ের মধ্যে এরচেয়ে ভিন্ন কিছু করা সম্ভব ছিল না বলে সিরাজুল আলম খান বলেছেন। তিনি বলেন, আমরা ভাবলাম কিছু দিনের মধ্যে সম্মেলন করে আহ্বায়ক কমিটিকে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলে রূপ দিতে প্রয়োজনীয় সময় পাব। জাসদ গঠনে পাঁচটি আদর্শকে প্রধান শর্ত হিসেবে সারা দেশে গড়ে উঠতে লাগল জাসদের সংগঠন।

১. যে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদের’ ভিত্তিতে দেশ স্বাধীন হলো সেটি হবে প্রধান বৈশিষ্ট্য। ২. জাতীয়তাবাদকে ধারণ করে সমাজতন্ত্র অভিমুখী নিজেদের চালিত করতে হবে। ৩. জনগণের অভ্যন্তরীণ নানা পার্থক্য ও সামাজিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। ৪. সশস্র সংগ্রামের ভিতর দিয়ে বেরিয়ে আসা স্বাধীনচেতা যুব সমাজকে নিয়ে দলকে সংগঠিত করা। ৫. আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দলটি কোনো বিশেষ দেশ বা শক্তির ক্রীড়নকে পরিণত না হয় সেটি বিবেচনায় রাখা।

সিরাজুল আলম খান বলেছেন, এ সময় কোনো কোনো মহল ‘জাতীয় সমাজতন্ত্র’ কথাটির সঙ্গে হিটলারের নাৎসিদের ‘ন্যাশনাল সোস্যালিজম’-এর মিল উল্লেখ করে অপপ্রচার শুরু করে। সেটি ব্যর্থ হলে দলটি জনগণের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করে ও যুব সমাজের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সে সময়কার প্রতিষ্ঠিত দলগুলো, বিশেষ করে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের ন্যাপ নিঃশর্ত সমর্থন দিচ্ছিল সরকারকে। সিরাজ শিকদারের সর্বহারা পার্টি সরকারের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের চেষ্টা করছিল। জাসদ ও সর্বহারা পার্টির কর্মসূচি সরকার ও আওয়ামী লীগকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। জাসদ হরতাল কর্মসূচি দিয়ে, সর্বহারা পার্টি সশস্র উপায়ে সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে।

সিরাজুল আলম খান বলেছেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে র সময় জাসদ নেতাদের সবাই ছিলেন কারাগারে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার শেষ সাক্ষাতে তিনি তাকে ভারতে চলে যেতে বলেন। তখন বাকশাল কায়েম হয়েছে। আমি বঙ্গবন্ধুর কাছে ঢাকার সব মহলে সামরিক শাসনের গুঞ্জনের কথা তুলতেই তিনি বললেন, ‘আমি জানি, ওটা আমার বিরুদ্ধে নয়। ওটা তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধে।’ এটি শুনে আমি নির্বাক হয়ে গিয়েছিলাম।

তিনি আরও বললেন, ‘বেশি কিছু হলে তারা আমাকে রেখেই যা করার করবে। আর তারচেয়ে বেশি খারাপ কিছু হলে আমাকে মনপুরায় নিয়ে রাখবে।’ আমার মনে হলো একি শুনছি! আগস্টের ১ বা ২ তারিখে আমি ভারতে গেলাম। ১৫ আগস্ট ১১টার দিকে রেডিওতে নৃশংস হত্যাকান্ডে র কথা শুনলাম। ঘটনাটি স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারিনি। তার পরিণতি রাজনৈতিকভাবে না হয়ে, এভাবে মর্মান্তিকভাবে হলো পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ- এ সত্যটি মেনে নিতে আমার খুবই কষ্ট হয়েছে। কারও রাজনৈতিক বিরোধিতা আর তাকে সপরিবারে হত্যা দুটো এক জিনিস নয়।

সিরাজুল আলম খান বলেছেন, জিয়ার শাসনামলেও সরকারি দমননীতির পাশাপাশি জাসদ এক রাজনৈতিক কূটকৌশলের শিকার হয়। দল ভাঙার ষড়যন্ত্রে জাসদ বিভক্ত হয়। আমি নিজে কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হইনি। এটি আমার ঘোষিত নীতি। জেলে থাকাকালে জাসদ একবার আমাকে কমিটিতে রাখলেও বের হয়ে পদত্যাগ করি।

সিরাজুল আলম খান জাসদের ওপর সরকারি দলের ও রক্ষী বাহিনীর নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে বলেছেন, বঙ্গবন্ধু সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করার কৌশলের অংশ হিসেবে দেশের ৪০টি স্থান ঘাঁটি আকারে গড়ে তোলার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়। জনসভা ও মিছিলকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করা হয়। দেশজুড়ে মিছিল-সমাবেশ চলতে থাকে। ’৭৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে আওয়ামী লীগ সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করার সময় নির্ধারণ করে আন্দোলনের এ পর্যায়ে সে বছর ১৭ মার্চ ঢাকায় বড় জনসভা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সেদিন পল্টনে বিশাল জনসভা শেষে মেজর জলিল ও রবের নেতৃত্বে মন্ত্রীপাড়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর বাসার সামনে উপস্থিত হয়। তার ভাষায় মিছিলটি ছিল একেবারেই শান্তিপূর্ণ। কিন্তু কোনো রকম উসকানি ছাড়া পুলিশ ও রক্ষী বাহিনী বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করলে ১১ জন কর্মী নিহত হন। মেজর জলিল ও আ স ম রব গ্রেফতার হন। বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গবদ্ধ আক্রমণ সহ্য করা নিরস্ত্র কর্মীদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। জাসদ কর্মীরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় পড়ে। আন্দোলনে ভাটা পড়ে।

এ অবস্থায় সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করার আন্দোলন কর্মসূচি পরিবর্তন করা হয়। মুক্ত নেতারা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান। প্রকাশ্য রাজনীতি সীমিত হয়ে আসতে থাকে। দলের তরফে এ সময় গোপন রাজনীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। গ্রামপর্যায়ে কৃষকদের সমর্থন লাভের জন্য স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করা হয়। কৃষকদের সহায়তা দিয়ে তাদের সমর্থন পেতে থাকে। এতে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর ওপর নির্যাতন শুরু হয়। মামলা হতে থাকে। কোথাও কোথাও রক্ষী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। সে সময় আত্মরক্ষার জন্য স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী কোথাও কোথাও রক্ষী বাহিনীর কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তিনটি থানার অস্ত্র লুট করে। মাদারীপুরে শাজাহান খানের নেতৃত্বে থানা লুট হয়। প্রশাসনের কাছে ও মানুষের কাছে এটি প্রথমে ‘গণবাহিনী’ ও পরে বিপ্লবী গণবাহিনী হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকে। যদিও জাসদের ‘সিওসি’ বা কেন্দ্রীয় কমিটি কখনো এ নামের কোনো সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেনি কিংবা করার অনুমতি দেয়নি। এটি ছিল জাসদ সম্পর্কিত গণবিভ্রান্তির একটি উদাহরণ। ’৭৬ সালের সেপ্টেম্বরে সিওসির শেষ মিটিংয়ে গণবাহিনীর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর কিছু সদস্য কিছু কিছু অঘটন ঘটিয়েছে। যার মধ্যে থানা আক্রমণ ও বিত্তশালীদের কাছ থেকে জোর করে অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটেছে। হোটেল ইন্টারকন্টিন্যান্টালে বিস্ফোরণ, বায়তুল মোকাররমে সাইকেল বোমা, বাসে যাত্রী নামিয়ে আগুন লাগানো, জিয়াউল আবেদীন হত্যা ও ভারতীয় হাইকমিশনারের ওপর সশস্র আক্রমণ ঘটানো হয়েছিল। সিরাজুল আলম খান বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পরিস্থিতি সৃষ্টি না হওয়ায় আমরা রাজনীতির ভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করি। এর মধ্যে প্রধান হলো- সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ গড়ে তোলা। ’৭৩ সালের মাঝামাঝি থেকে জাসদ সভাপতি মেজর জলিলের নেতৃত্বে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টর প্রায় সব ইউনিটে এবং বগুড়া ক্যান্টনমেন্টে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা গড়ে ওঠে। ঢাকার চারপাশে প্রায় ৪০টি স্থানে ঘাঁটি গঠন এবং ঢাকাসহ জেলা ও মহকুমা শহরে গণবিস্ফোরণমূলক আন্দোলন গড়ে তুলে সরকারের পতন ঘটানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার পর ক্ষমতা দখলে ভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়। সেটি হলো- সেনাবাহিনীর মধ্যে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতৃত্বে সেনাঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে কেন্ত্রীয় ক্ষমতা দখল করা।

সিরাজুল আলম খান বলেন, ভারতে প্রশিক্ষণ চলাকালে কামালপুর যুদ্ধে গুরুতর আহত কর্নেল তাহেরের নাম শোনেন। গণকণ্ঠ অফিসে তাদের প্রথম দেখা ও আলোচনা শুরু হয়। প্রথম জাতীয় কমিটিতে জাসদের তিন নম্বর সহ-সভাপতি তাকে রাখা হয়। তখনো তিনি সেনাবাহিনীর নিয়মিত সদস্য। তাই নাম ঘোষণা হয়নি। অনেক দিন পর একদিন কর্নেল তাহের আমাকে বললেন, ‘সিরাজ ভাই, যদি কোনো দিন সুযোগ আসে আমাকে একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর কাজে লাগাতে পারবেন।’ আমি বললাম, ‘সে কাজটি যদি আপনি কখনো করেনও, ক্যান্টনমেন্টের মধ্যে বসে করতে পারবেন না।’ কর্নেল তাহের তাকে তার অনেক ইচ্ছার কথাও জানালেন। চলবে......। 

নওগাঁ দর্পন
নওগাঁ দর্পন