মঙ্গলবার   ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আশ্বিন ১ ১৪২৬   ১৭ মুহররম ১৪৪১

নওগাঁ দর্পন
সর্বশেষ:
পত্নীতলায় আদিবাসী প্রেমিক যুগলের লাশ উদ্ধার চাকুরির প্রলোভনে মান্দার মেয়েকে ঢাকায় ধর্ষণ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে যুক্ত হওয়া বোয়িং (৭৮৭-৮) ড্রিমলাইনার গাঙচিল উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধামইরহাটে মাদক সেবনের দায়ে ৬ জনের জেল ও জরিমানা আত্রাইয়ে ডেঙ্গু সচেতনতা মূলক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সাপাহারে পরিস্কার অভিযান সাপাহার ঐতিহ্যবাহী জবই বিলে মাছের পোনা অবমুক্ত আত্রাই থানা পুলিশের অভিযানে ৯জন আটক গ্রেনেড হামলার প্রতিবাদে নিয়ামতপুরে আলোচনা সভা সাপাহারের করল্যা চাষে বিপ্লব
২২৯

জামায়াত নিয়ে উভয়সংকটে বিএনপি

প্রকাশিত: ১৪ জানুয়ারি ২০১৯  

স্বাধীনতাবিরোধী দল জামায়াতকে নিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও নানা রকমের সংকটে ছিল বিএনপি। ড. কামাল হোসেনের দল গণফোরামসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল বিএনপির সঙ্গে জোট গড়তে দেরি করে মূলত জামায়াতের কারণে। একপর্যায়ে ২০ দলীয় জোটের বাইরে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে নতুন জোট গড়া হলেও জামায়াত নেতাদের ধানের শীষ প্রতীক দিয়ে আসন ছাড় দেওয়ায় নির্বাচনের পর অসন্তোষ ব্যক্ত করেন ড. কামাল হোসেন। জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে বিএনপির ওপর চাপ প্রয়োগ করবেন বলেও গত শনিবার জানিয়েছেন ঐক্যফ্রন্টের এই শীর্ষ নেতা। বিএনপির মধ্যম সারির অনেক নেতাও এখন মনে করছেন, জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকায় বিএনপি নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁদের মতে, জামায়াতকে জোট থেকে বের করে দেওয়া উচিত। তবে ভোটের হিসাবসহ নানা কারণ দেখিয়ে দলটিকে দূরে ঠেলে দিতে চাইছে না বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। বিএনপি ও এর মিত্র দলগুলোর বিভিন্ন স্তরের বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন গত শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘জামায়াতকে নিয়ে আমরা রাজনীতি কখনো করিনি, কোনো দিন রাজনীতি করার কথা চিন্তাও করিনি। যেটা বলা হয়েছে যে করেছি, সেটা আমি সঙ্গে সঙ্গে বলেছি, এটা তো আমাদের বলা হয়নি, তারা (জামায়াত) থাকবে এটার মধ্যে। ভবিষ্যতে এ ব্যাপারটি একদম পরিষ্কার। জামায়াতকে নিয়ে আমরা রাজনীতি করব না।’ তিনি আরো বলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে অতীতে যেটা হয়েছে, সেটা অনিচ্ছাকৃত ভুল। তারা যে ধানের শীষে জামায়াতের ২২ জনকে মনোনয়ন দেবে, সেটা আমরা জানতাম না।’

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য বজলুল করিম আবেদ বলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার পর থেকেই বিএনপি নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিএনপির অনেক সময় ব্যয় করতে হবে। তাই আমি মনে করি, এ মুহূর্তে জামায়াতকে জোট থেকে বের করে দেওয়া উচিত।’

স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবু বলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির আদর্শগত কোনো মিল নেই। ভোটের হিসাবে তাদের সঙ্গে জোট করা হয়েছিল। এখন সময় এসেছে তা নতুন করে ভেবে দেখার।’

জানা গেছে, স্বাধীনতাবিরোধী দলটিকে জোটে রাখা না রাখার ব্যাপারে বিএনপিতে দুই ধরনের মত থাকলেও ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে মত বেশি। বিশেষ করে ছাত্রদল থেকে উঠে আসা দলটির মধ্যম সারির বেশির ভাগ নেতাই এ পরামর্শ দিয়েছেন বিএনপির হাইকমান্ডের কাছে। ফলে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার চাপ বাড়ছে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ওপর।

বিএনপির দুঃসময়ের বন্ধু হিসেবে পরিচিত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘জামায়াতের উচিত তাদের পূর্বপুরুষের কৃতকর্মের জন্য পাবলিকলি ক্ষমা চাওয়া। আমাদের ঐক্যফ্রন্টের মূল কথাই ছিল আমরা জামায়াতকে নেব না। ড. কামাল সাহেবের বক্তব্য আমরা পূর্ণ সমর্থন করি। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের রাজনীতি করার অধিকার থাকলে জামায়াতেরও আছে। কিন্তু অন্যরা মানবতাবিরোধী অভিযোগে অভিযুক্ত নয়। জামায়াত ক্ষমা চাইলে তাদের রাজনীতি করতে দেওয়া উচিত।’ তিনি আরো বলেন, ‘একটি জিনিস প্রমাণিত, ভোটের বাজারে জামায়াতকে দিয়ে বিএনপি কোনো লাভবান হয়নি। এখন জামায়াত যদি ক্ষমা চেয়ে রাজনীতি করতে চায় তা হলে আমরা ভেবে দেখব। তা না হলে বিএনপির উচিত তাদের বর্জন করা।’

জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার বিষয়ে বিএনপিকে বলা যেতে পারে বলে ড. কামাল হোসেন এর আগে যে মন্তব্য করেছেন সে প্রসঙ্গে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু বলেন, ‘এ বিষয়ে এরই মধ্যে বিএনপির মহাসচিবকে বলা হয়েছে। জামায়াত ধানের শীষে নির্বাচন করলেও, ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে নেই। তাই তাঁরা এ বিষয়টির সুরাহা চান।’

জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালেক রতন বলেন, ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমার মনে হয় বিএনপিই জামায়াত ত্যাগ করবে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, খালেদা জিয়ার সঙ্গে চলতি সপ্তাহে দেখা করার চেষ্টা করছেন দলের সিনিয়র নেতারা। সেখান থেকে হয়তো একটি সিদ্ধান্ত আসবে। সেই সিদ্ধান্তের পর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা হবে। এরপর জামায়াতকে জোটে রাখা বা না রাখার একটি সিদ্ধান্ত আসবে। ওই নেতা জানান, তাঁদের সপ্তম কাউন্সিল করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। সেখানেও এসব বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হতে পারে।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, নানামুখী দাবির পরিপ্রেক্ষিত আপাতত ‘ধীরে চলো নীতি’ অবলম্বন করছে বিএনপি। বিএনপি চেয়ারপারসন কারাবন্দি খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লন্ডনে থাকা তারেক রহমানের পরামর্শের পরই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে দলটি।

বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা অবশ্য জানান, জামায়াতকে না খেপিয়ে বরং আপাতত ‘সাইড লাইনে’ রাখার চিন্তা আছে। তারা যেমন ২০ দলীয় জোটেও থাকবে না আবার তাদের বাদও দেওয়া হবে না—এমন একটি পন্থা অবলম্বন করতে চাইছে বিএনপির হাইকমান্ড।

এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র নেতারা মুখ খুলতে নারাজ। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমাদের দলের মুখপাত্র এ বিষয়ে কথা বলবেন। আমি কিছুই বলতে চাই না।’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘নো কমেন্ট। আমি এ ব্যাপারে এখন কিছু বলতে চাই না।’

তবে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমন্বয়ক মোহাম্মদ শাহাজাহান বলেন, ‘জামায়াতকে নিয়ে রাজনীতি করবেন না বলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে কিছু কথা বলা হয়েছে। সেটি পত্রিকার মাধ্যমে দেখেছি। আমার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তা আসেনি। তবে আমি মনে করি, ৩০ ডিসেম্বর যে নির্বাচন হয়েছে, তাতে পরিষ্কার এই স্বৈরতান্ত্রিক শক্তিকে সরাতে হলে দল-আদর্শ-মত-নির্বিশেষে লড়াই করতে হবে। এ সময়ে কাকে বাদ দেব কাকে রাখব সেটি না দেখে উচিত হবে গণ-আন্দোলনের প্রস্তুতি নেওয়া এবং বিভেদ ভুলে আরো ঐক্যবদ্ধ হওয়া।’

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘ড. কামাল হোসেন জামায়াতের সঙ্গে রাজনীতি করবেন না বলে জানিয়েছেন। তার এই প্রস্তাবকে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি। একই সঙ্গে তার কাছে আমাদের দাবি, তিনি (ড. কামাল) যেন আওয়ামী লীগের কাছে আহ্বান জানান, যেসব জামায়াত নেতাকে আওয়ামী লীগ ফুল দিয়ে বরণ করে নিয়েছে, যাদের ইউনিয়ন, উপজেলা পর্যায়ে চেয়ারম্যান, মন্ত্রী-এমপি বানিয়েছে তাদের যেন বাদ দেওয়া হয়। তাতে জনগণ খুশি হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘জামায়াতের নিবন্ধন নির্বাচন কমিশন দিয়েছে। হাইকোর্টেরও একটি রায় আছে। এরপর জামায়াতকে কেন আওয়ামী লীগ বাদ দিচ্ছে না। এখন শুনছি দল হিসেবে জামায়াতের বিচার করতে আইন সংশোধন করা হবে। এটা নিয়েও তারা রাজনীতি করতে চায়।’

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের সময়ই জামায়াতকে নিয়ে সমস্যার তৈরি হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচন সামনে চলে আসায় কিছুটা গোজামিল দিয়েই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করা হয়। পরে বিষয়টি সামনে চলে আসে নির্বাচনে প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে। বিএনপির পক্ষ থেকে জামায়াত নেতাদের ধানের শীষ প্রতীক দেওয়ায় তা মেনে নিতে পারেননি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অনেক নেতা। সে সময় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এ নিয়ে গণফোরাম নেতা মোস্তফা মহসিন মন্টুর সঙ্গে বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও নজরুল ইসলাম খানের বাগিবতণ্ডাও হয়েছিল। পরে নজরুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, বিএনপি জামায়াতের কোনো প্রার্থীকে ধানের শীষ প্রতীক দেয়নি। তারা সবাই বিএনপির প্রার্থী। এ নিয়েও সে সময় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল।

ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির একাধিক সূত্রের দাবি, আগামী তিন মাসের মধ্যে আরেকটি সংসদ নির্বাচন টার্গেট করেই কাজ করছে তারা। এরই মধ্যে বহির্বিশ্বের সমর্থন আদায় এবং আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করা, জামায়াতকে বাদ দিয়ে ফ্রন্টের পরিধি বাড়িয়ে সরকারবিরোধী সব রাজনৈতিক সংগঠনকে একমঞ্চে আনা এবং তৃণমূলের সংগঠনকে শক্তিশালী করার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, এরই মধ্যে বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যান কয়েকটি বাম দলের নেতাদের সঙ্গেও আলোচনা করেছেন। সেখানেও জামায়াতের ব্যাপারে কথা এসেছে।

অন্যদিকে ২০ দলীয় জোটের শরিক এলডিপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম অবশ্য বলেন, ‘রাজনৈতিক মাঠে যাই হোক, ভোটের অঙ্কে জামায়াতের একটি অবস্থান আছে। বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল। তাদের নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যে ভাষায় কথা বলছে, সে এখতিয়ার তাদের আছে কি না—এটা আমার প্রশ্ন। জামায়াতকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে চাপ প্রয়োগকে আমি ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের অংশ বলে মনে করি। জোটে জামায়াতকে নিয়ে আমাদের তো কোনো সমস্যা হচ্ছে না। ভোটের সময় ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থীরা কি জামায়াতের ভোট পাননি!’

নওগাঁ দর্পন
নওগাঁ দর্পন
এই বিভাগের আরো খবর